top of page
  • Drabir Alam

আয়রনম্যানের ১৭ ঘন্টা


১৬ ঘন্টা ৫৪ মিনিট। বিব নাম্বার ১১৯৯। দ্রাবিড়। আয়রনম্যান।


কিন্তু শুরুটা আরো আগে৷ আরো অনেক আগে।


ক্লাস সেভেন অথবা এইটে পড়ি। ১৯৯৭ সালের কোন এক সময়ে। সঠিক দিন তারিখ মনে নেই। পূজোবার্ষিকী আনন্দমেলায় একটা গল্প ছাপা হল। নাম ছিল মনে হয় "তুলসী"। সাধারণ এক মেয়ের ট্রায়াথলনের সাথে পরিচয় এবং প্রথম ট্রায়াথলন করা যেখানে সাথে ছিল বলরাম গড়গড়ি বলে একজন মধ্যবয়স্ক ছাপোষা মানুষ। মতি নন্দীর লেখা। ওই গল্পের ভেতরে একটা লাইন ছিল আয়রনম্যান ট্রায়াথলন নিয়ে। ৩.৮ কিলো সমুদ্রে সাঁতার, ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং আর শেষে পুরো ম্যারাথন দৌড়, ৪২.২ কিলোমিটার।


স্কুলের সবচাইতে আনস্পোর্টি টিনএজার আমি। ফুটবল ক্রিকেট কিছুই পারি না। স্পোর্টস ডে-তে ইনিশিয়াল হিটেই বাদ পরে যাই। আয়রনম্যানের লাইনটা পড়ে একটা কথাই ভেবেছিলাম, " বাবারে বাবা, কি ভয়ংকর!"


এরপর পেরিয়েছে দুই যুগ। হঠাৎ একদিন আলোচনায় Tahsin I. Alam । বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত প্রবাসী তাহসিন ভাই প্রথম করলেন আয়রনম্যান। ভাত খাওয়া দেশী আমরাও যে পারি সেটা দেখালেন। আমি দেখলাম এবং কংগ্রাচুলেশনস জানালাম, তারপর আবার সাইকেল চালাতে গেলাম। ট্রায়াথলনে আমার কি কাজ?


তারপর আসলেন Imtiaz Ilahi ভাই। বদ্ধ উন্মাদ এই মানুষটা আমাদের সাথে আস্তে আস্তে সাইকেল চালাতে লাগলেন। একদিন জানলাম ওনার প্যারাশুট এক্সিডেন্টে মেরুদন্ড ভাঙার কাহিনী। চোখের সামনে দেখলাম কিভাবে ঠিকমত হাঁটতে না পারা মানুষটা কিভাবে সাইক্লিং, তারপর সুইমিং আর রানিং করতে করতে একদিন চলে গেলেন লাংকাউই। আয়রনম্যান মালয়েশিয়াতে উনি হবেন আয়রনম্যান।


কি প্রবল উত্তেজনা ছিল সেদিন। ১৭ ঘন্টা ধরে আমরা দেখছিলাম ওনাকে। সে কি টেনশন আমাদের। অবিশ্বাস্য ভাবে মাঝরাতের পর উনি যখন ফিনিশ লাইন পার হলেন বাংলাদেশের এই কোনা থেকে হতভম্ব হয়ে আমরা দেখছিলাম আমরা।


ওইদিন শুরু।


মাথার কোন এক কোনায় ছোট্ট একটা চিন্তা, আয়রনম্যান।


সময় কাটতে লাগে, আশেপাশে আসতে থাকে আরো আয়রনম্যান। আরাফাত, রিপন ভাই, সিগফ্রিড, স্টেফান, কতজনের নাম বলবো? তখন ঠিক করলাম ২০২২-এ করবো, বয়স হবে চল্লিশ তখনই করতে হবে আয়রনম্যান।

তারপর আসলো করোনা, আরো কত কি। বাংলাদেশের হয়ে অংশ নিলাম বিশ্ব সাইক্লিং চ্যাম্পিয়নশিপে তাই ২০২২এ ছেড়ে দিতে হল সুইমিং আর রানিং। হাত ভাংলাম, কলারবোন ছুটে গেল এক্সিডেন্টে, এমন সময় ইমতিয়াজ ভাইয়ের মেসেজ। ২০২৩ এর শুরুতে। "আয়রনম্যান মালয়েশিয়ার রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়েছে। একটা হাফ আয়রনম্যান দিয়ে ফেল।"


হাফ?


হাফ কেন?


দিলে, পুরোটাই দেই?


রেজিস্ট্রেশন করে জানালাম ভাইকে, "করে ফেলসি! ফুল।"

নির্বিকার মুখে উনি বললো, "সাবাশ, হয়ে যাবে!"


শুরু হল ট্রেইনিং। ভালো করবার না, সার্ভাইভ করার।


সাঁতার কাটতে পারি না ১০০মিটারের বেশী। Tahmeed Azizul Huq দিলেন পুলের এক্সেস। নামিরকে স্কুলে নামিয়ে এক ঘন্টা প্র‍্যাক্টিস করে অফিসে দৌড়াই। শীতকালে এক সাথে প্র‍্যাক্টিস করি আমরা কয়জন (শুভ, রিপন ভাই আর ইমতিয়াজ ভাই)। নিউমোনিয়া বাধিয়ে ডিসেম্বর মাসে দিলাম জীবনের প্রথম ম্যারাথন। বংগবন্ধু ম্যারাথনে। ক্র‍্যাম্প নিয়ে শেষ করলাম ৫ ঘন্টায়। কানে ধরলাম। জীবনে আর একটা ম্যারাথন দিবো। আয়রনম্যানের শেষেরটা। আর লাগবে না বাবা।


দিন ঘনিয়ে আসে। রাকিব কোচিং প্ল্যান দেয়। নাদিয়া নামিরকে স্কুলে নামায় মংগলবারে যাতে আমি একদিন লম্বা সাঁতার কাটতে পারি শাহাবুদ্দিন পার্কে।


তারপর অক্টোবরের সাত তারিখে সকাল সাতটায় আমি লাংকাউইয়ের সমুদ্রের পাড়ে। মাথায় সবুজ ক্যাপ। স্লোয়েস্ট সুইমারদের সাথে নামবো।


শুরু হচ্ছে আমার আয়রনম্যান।


শুরুর কয়েকশো মিটার আনন্দের সাথেই গিয়েছি। সত্যি বলতে পানিতে বেশ লাগছিল। কুসুম গরম পানি। বুঝি নি তখন, ওভারহিটেড হচ্ছিলাম। প্রথম ল্যাপ শেষ করে টলতে টলতে উঠি। পাড়ে সেউতি আপু, রুহ আর রাফাত পাগলের মতন হাত নেড়ে উৎসাহ দিচ্ছে। ছবি তুলছে পিযুষ। একটা জেল খাই। মাথা কাজ করছে না। দৌড়ে গিয়ে আবার পানিতে ঝাঁপাই।


টের পাই স্কিনস্যুটের ঘষায় গলার কাছে ছিলে গিয়েছে, জ্বলছে লবণ পানিতে। কি আর করবো, চলতে থাকি। সময় নেই। ২ ঘন্টা ২০ মিনিটের মাঝে উঠতে না পারলে বাতিল হয়ে যাব। রেস থেকে বের করে দেবে।


সাঁতার পারি না ভালো। গায়ের জোরে, খামচে খামচে কোনমতে পানি থেকে উঠি। উদ্ভ্রান্ত চেহারায় দেখি ২ ঘন্টা ১০ মিনিট হয়েছে। বেঁচে উঠি। পেরেছি।


গা মুছি। সাইকেলের জুতা আর হেলমেট পড়ি। জেল খাই, এন্টিসেপ্টিক, ক্রিম আর সানস্ক্রিন মাখি। সাইকেলে উঠি। কিন্তু পা চলে না।


চলে না তো চলেই না। সুইমিং সময়মত শেষ করতেই শেষ হয়ে গিয়েছি। ছোট ব্রিজে উঠতেও গিয়ার নামিয়ে আস্তে উঠতে হচ্ছে। নিজেকে বোঝাই, আস্তে আস্তে ফিরবে শক্তি। খেতে থাকি। চলতে থাকি। দাতাই হিলে ইমতিয়াজ ভাইকে দেখি, চিৎকার করে উনি জানায়, "পানি থেকে উঠে গেসো, বাকিটা পারবা।"


আমি বিশ্বাস করি। আসলেও তো। পানি থেকে উঠে গিয়েছি, আমি পারবো।


৩০ কিলোমিটার পর থেকে পা আবার কাজ করতে শুরু করে৷ ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে কোর টেম্পারেচার নেমে আসে, রিকাভারি হয়। স্পিড একটু বাড়াই। কিন্তু বেশী না। আরো বহুদূর বাকি।


কয়েকজনকে পার হই। উৎসাহ বাড়ে। আর বাড়ে গরম। পানি খাই, জেল খাই, গেটরেড খাই। কিন্তু আসি আসি করতে থাকা ক্র‍্যাম্পটা আরো কাছে আসতে থাকে। দ্বিতীয়বারের মতন দাতাই হিলে আসি। প্রথমবার ১৮কিলো এভারেজ স্পিডে ওঠা পাহাড়ে এবার উঠতে পারি ২৮ কিলো এভারেজে। অতিরিক্ত সাহস বাড়ে।


আর বেশি পুশ করে ক্র‍্যাম্প খাই। কোনমতে একটু ছুটিয়ে নামি পাহাড় থেকে। মেডিক্যাল বুথে স্প্রে দিয়ে আগাই। আরো ৭০ কিলো বাকি, সময় কমছে। সন্ধ্যা ছয়টার আগে পৌঁছাতে হবে। নাহলে আবার বাদ পরবো।


সময় দেখি। শেষ তিনটা পাঞ্চি ক্লাইম্বে হেঁটে উঠি। শেষ ২০ কিলোমিটার উড়ে এসে (আসলে কচ্ছপের গতিতে, তখন এটাই অনেক স্পিড আমার কাছে) ছয়টা বাজার ১০ মিনিট আগে ঢুকি দৌড়ের ট্রানজিশনে। শেষের শুরু। একটু কি আশা জাগে? হয়ত।


আবার ক্রিম, এন্টিসেপটিক, স্যালাইন আর জেল। ম্যারাথনের শুরু। আস্তে আস্তে দৌড়াই, ক্র‍্যাম্প খাওয়া পা জানান দেয়, "আমরা আছি, তবে কতক্ষণ জানি না।" রাস্তায় দেখা হয় বেলাল ভাই, ইমতিয়াজ ভাই, মিশু ভাইয়ের সাথে। হাই ফাইভ করি, কচ্ছপের গতিতে জগিং চলে।


প্রথমবারের মতন ফিনিশ লাইনের কাছে আসি। হতাশ হয়ে শুনি বাকি ফিনিশারেরা শেষ করছে। আরাফাত পরে আছে একপাশে আইস ব্যাগের তলায়। মাসুদ ভাই, রিপন ভাই, সাকলাইন ভায়েরা শেষ করেছেন ওনাদের হাফ আয়রনম্যান। ওনাদের রেখে প্রথম ল্যাপের রিস্টব্যান্ড নেই। পথ চলতে থাকে এয়ারপোর্টের দিকে।


১৪ কিলোমিটার থেকে ক্র‍্যাম্প শুরু হয়। একটু হাঁটি, একটু দৌড়াই, একটু খাই, একটু মেডিক্যাল টিমের সাপোর্ট নেই। ঘড়ির কাঁটা চলতে থাকে, ট্র‍্যাক খালি হয়ে আসে, সন্ধ্যা নামে। দ্বিতীয় ল্যাপের ব্যান্ড নিতে আসি। পরিচিত কাউকে দেখি না ফিনিশ লাইনে। সেখানে শুধু আনন্দের চিৎকার। আমি বেরিয়ে যাই। আবার রাস্তায়।


অন্ধকার। আমি একা। টিমটিমে কিছু লাইট জ্বলছে। হঠাৎ হঠাৎ মানুষের জটলার কাছে আসি। বিব দেখে ওরা নাম ধরে ডাকে। চমকে উঠি, আবার দৌড়াই। আবার ক্র‍্যাম্প। আবার মেডিকেল সাপোর্ট। আবার দৌড়। আবার হাঁটা।

রাস্তা অন্ধকার। টিমটিমে বাতি। চার্জ শেষ হয়ে এসেছে ওগুলোরো। গরম বাড়ছে। হয়ত বাড়ছিল না। হয়ত ফ্যাটিগ। কে জানে। অংক কষি।


৯ মিনিটে এক কিলোমিটার গেলে দশ কিলোমিটার যেতে সময় লাগবে ৯০ মিনিট। সময় আছে আশি মিনিট। দৌড়াতে চাই। পারি না।


শেষবারের মতন ইউ-টার্নে আসি। দাড়িওয়ালা কাটঅফ জাজ, যিনি ঠিক করেন যে কে বেশী স্লো এবং কাকে আর এগোতে দেয়া হবে না, তাকে দেখতে পাই। সারাদিনে তাকে আরো দেখেছি কিন্তু এবারে বুঝতে পারি উনি আমাকে দেখছে।


মেডিকেল টিমের কাছে যাই। বলি শেষবারের মতন এমনভাবে অয়েন্টমেন্ট আর ম্যাসাজ করে দিতে যেন শেষ করতে পারি। আলো প্রায় নিভে আসা বুথে স্প্রে আর অয়েন্টমেন্ট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরা সেই অচেনা মেডিক্যাল টিমকে বুকভরা ভালবাসা।


আট কিলোমিটার বাকি, না দৌড়ালে সময়মত পৌঁছাবো না। উপরওয়ালার কাছে শক্তি চাই। শেষবারের মতন দৌড় শুরু করি। থামা যাবে না। থামলেই শেষ।


দৌড়াতে থাকি। একজনকে পার হই, আর দৌড়াতে পারছিল না সে। এম্বুলেন্সের আওয়াজ পাই, তাকে তুলে নেয়। আরো দৌড়াই। কাটঅফ জাজকে আবার দেখি আমার পাশে। স্কুটার নিয়ে পাশে পাশে যাচ্ছে। দাঁত চেপে পায়ের ব্যাথা চেপে স্পিড বাড়াই। আরো এক মিনিট তার স্কুটারের হেডলাইটের আলো আমার সামনে পরে। আমি চলতে থাকি। স্কুটার থেমে যায়। আমি আগাই।


৪ কিলোমিটার বাকি। নামির আর নাদিয়ার কথা ভাবি, মেডেলটা পেলে নামির কত খুশি হবে সেটা ভাবি, আরেকটু জোরে দৌড়াই। রাস্তায় তখনো মানুষ, রাত সাড়ে বারোটা। ওরা আমার নাম ধরে চিৎকার করে। আমি আরো দৌড়াই।


৩ কিলোমিটার বাকি। রিপন ভাই দৌড়ে আসি।

"ভাই, স্পিড বাড়ান। নাহলে হবে না।"


আমি হিসাব করি, হবে। থামা যাবে না।


২ কিলোমিটার বাকি, ফিনিশ লাইনের হোটেলের সামনে দিয়ে যাই, ভেতর থেকে গানের শব্দ আসে। আমি দৌড়াই। ওই গান থামার আগেই যেতে হবে।


১ কিলোমিটার বাকি, মনে হয় যদি আবার না পারি তাহলে তো আবার আসতে হবে। দৌড়ের গতি বাড়ে।


২০০ মিটার বাকি। ফিনিশ লাইন।


একটা বাংলাদেশের পতাকা হাতে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। মাথা কাজ করে না। চিনতে পারি না। কিন্তু পতাকাটা নেই। লাল কার্পেটে উঠি। মাইকে শুনতে পাই আমার নাম। মাথার ওপরে পতাকাটা ওড়াই। লাল-সবুজ। আর শুনতে পাই,


"কংগ্রাচুলেশনস দ্রাবিড় ফ্রম বাংলাদেশ। ইউ আর আয়রনম্যান"

...

পুনশ্চ: ফিনিশ লাইনে হাসিমুখ আসে নাই। ওগুলা মিডিয়ার সৃষ্টি। এটাই আসল ফিনিশের চেহারা। আর করতে হবে না। এটাই শান্তি।

コメント


DON'T MISS THE FUN.

Thanks for submitting!

FOLLOW ME ELSEWHERE

  • Facebook
  • Instagram

SHOP MY LOOK

No tags yet.

POST ARCHIVE

bottom of page